পাহাড়ি ঢলে ধানের ক্ষতি, চিন্তিত নয় মন্ত্রণালয়!

পাহাড়ি ঢলে ধানের ক্ষতি, চিন্তিত নয় মন্ত্রণালয়!

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ৯ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হলেও চিন্তিত নয় খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়। যে পরিমাণ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা মোট আবাদের এক শতাংশ।

দেশের মোট খাদ্যের চাহিদা ও যোগানের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ধানের ক্ষতি কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। এছাড়া চলতি বছর ভালো ফলন হয়েছে বলে জানান তারা।
বাজারে কোথাও চালের সংকট নেই। বাজার ও মিলারদের কাছে হাজার হাজার টন চাল রয়েছে। বর্তমানে গুদামে মজুদ রয়েছে ১৪ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য। ফলে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রায় কোনো ঘাটতি হবে না। হাওরে ধানের ক্ষতির জন্য চালের দামে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কৃষকদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে প্রণোদনাসহ অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হবে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

খাদ্য সচিব ড. নাজমানারা খানু বলেন, এ বছর ৭ জেলার হাওরে ৪ লাখ ৫২ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য ছিল ১৩ লাখ টন চাল পাবে। আগাম প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক। তবে ক্ষতির পরিমাণ অত বেশি না। দেশে ২ কোটি ৫৮ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্য। আর হাওরে ৭ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকিগুলো ডুবে গেলেও ধানটা কাটতে পেরেছে। সে হিসাবে আমাদের ভয়ের কিছু নেই। বাংলাদেশের কৃষি হচ্ছে প্রকৃতির জুয়া খেলা। সামনে কোনো দৈবদুর্বিপাক না হলে আমরা মোটেও চিন্তিত নই। আর হাওর নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। আবহাওয়া ভালোর দিকে, হাওরের ৬০ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, এ বছর আমাদের ভালো ফলন হয়েছে। আমরা যদি আরও ১০টা দিন ভালো আবহাওয়া পাই। আর যদি কোনো বিপর্যয় না আসে তাহলে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা পূরণ করতে পারবো। হাওরে যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা নিয়ে আমরা কিছু মনে করছি না।

দ্রব্যমূল্য নিয়ে খাদ্য সচিব বলেন, হাওরে ধানের ক্ষতির ফলে চালের দামে কোনো প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করছি না। বিষয়টি আমরা কঠোর মনিটরিংয়ে রাখছি। আমাদের উৎপাদন ভালো, এখন সংগ্রহটা করতে পারলে অস্থিরতার কোনো কারণ নেই। বাজারে কোথাও চালের সংকট নেই। বাজার ও মিলারদের কাছে হাজার হাজার টন চাল রয়েছে। বর্তমানে আমাদের ১৪ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৩ লাখ টন চাল ও প্রায় দেড় লাখ টন গম রয়েছে। এছাড়া আরও আড়াই লাখ টন গম পাইপলাইনে আছে।

কৃষি সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম বলেন, আমাদের পুরো হাওর অঞ্চলের উৎপাদন যেটা দেশের মোট উৎপাদনের মাত্র ৬ শতাংশ। এর মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটা আমাদের জন্য ক্ষতি। বিশেষ করে ওই অঞ্চলে কৃষক যারা রয়েছে, তাদের জন্য একটা বড় ক্ষতি। তবে তা আমাদের দেশের মোট খাদ্যের চাহিদা ও যোগানের সাথে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। যদি পুরো হাওর নষ্ট হতো তাহলে দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতো।

প্রতি বছরই কিছু বাঁধ ভেঙে যায় উল্লেখ করে কৃষি সচিব বলেন, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণ হলো, পানির সাথে পলি পড়ে। সেই পলি জমে একদিক উঁচু অন্যদিক নিচু থাকে। এর ফলে বাঁধে চাপ পড়ে ভেঙে যায়। এজন্য খালগুলো পুনঃখনন করতে হয়। যান চলাচলের জন্য যে ড্রেজিং করা হয়, সেটা আরো নিবিড়ভাবে করতে বলা হয়েছে। এই দুটি সমস্যার সমাধান হলে বাঁধের ভাঙন কিছুটা রোধ করা যাবে। এছাড়া হাওর অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সেখানে আমাদের বলার কিছু থাকে না। বৃষ্টি যদি আগাম চলে আসে তাহলে আমাদের সমস্যা হয়।

তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয় বিজ্ঞানীদের নিয়ে কাজ করছে, যাতে এমন জাত আবিষ্কার করা, যা মার্চের মধ্যেই ধান পেকে যাবে। তাহলে দুর্যোগের আগেই কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারবেন। এপ্রিল মাসেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হয়। আমাদের এক শতাংশ ক্ষতি হয়েছে, এটাই যদি থাকে তাহলে মনে হয় না খুব বেশি প্রভাব পড়বে। যদি পুরোটা নষ্ট হয়, ২০১৭ সালে যেটা হয়েছিল। সেরকম কিছু হলে তাহলে বাজারে প্রভাব পড়ে। আমরা আউশের উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছি। হাওরের ক্ষতিটকু যাতে পুষিয়ে নেওয়া যায়।

হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য সহায়তা দেওয়া হবে জানিয়ে কৃষি সচিব বলেন, কৃষকদের আমরা বীজ, সারসহ ফসল উৎপাদনে যেসব প্রণোদনা দেওয়া হয়, সেগুলো দেওয়া হবে। এছাড়াও আমারা কৃষকদের ঋণের ব্যবস্থা করে থাকি। তবে কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া হবে। সেটা আগামী ফসলের আগে দেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে অন্যান্য মন্ত্রণালয় থেকে যা দেওয়া হয়, সেটা অব্যাহত থাকবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর দেশের হাওরভুক্ত ৭টি জেলা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জের হাওরে বোরো ধান আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৫২ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমিতে। আর নন-হাওরে আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ১৮০ হেক্টর জমিতে। মোট (হাওর ও নন-হাওর মিলে) আবাদ হয়েছে ৯ লাখ ৫০ হাজার ৩১৮ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ধান অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আক্রান্ত হয়েছে, যা মোট আবাদের শতকরা এক শতাংশ।

কৃষি মন্ত্রণালয়ন সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ৮০ শতাংশ পাকলেই হাওরের ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, পাকা ধান দ্রুততার সাথে কাটার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। ধান কাটার যন্ত্র কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য জেলা থেকেও নিয়ে আসা হয়েছে। এই মুহূর্তে হাওরে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার ধান কাটছে। যার মধ্যে ১ হাজার ১০০ কম্বাইন হারভেস্টার স্থানীয় আর ৩৫০টি কম্বাইন হারভেস্টার বহিরাগত বা অন্যান্য জেলা থেকে নিয়ে আসা।