মানবাধিকার কর্মীদের অপরাধের বিচার তাহলে করা যাবে না?

মানবাধিকার কর্মীদের অপরাধের বিচার তাহলে করা যাবে না?

রিফাত মাহমুদ || ধরুন, আপনি সারাজীবন আপনার প্রতিবেশীর সঙ্গে অত্যন্ত ভদ্র আচরণ করেছেন, কখনও আপনার নিজ বাসায় আপনি উঁচু স্বরে কথা বলেননি। দান খয়রাতে আপনার হাত ভালো, মানুষের বিপদে আপনি বেশিরভাগ সময় সাড়া দেন। আপনি একজন আসলে ভালো মানুষ। কিন্তু কাজের জায়গায় আপনার বিরুদ্ধে ঘুষ খাওয়ার অভিযোগ করেন অনেকে। সেটা হয়তো আপনার প্রতিবেশী বা পরিবারের মানুষদের জানা নেই। লুকিয়ে ছাপিয়ে দুর্নীতি এমন করেছেন যে একসময় প্রতারিত মানুষেরা এক হয়ে আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। প্রথম কাজ হিসেবে তারা আপনার ঘুষের তথ্যগুলো প্রকাশ করলো। এরপর একে একে আপনার যাবতীয় অপকর্ম বেরিয়ে আসতে থাকলো এবং আপনি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে ধরাও পড়লেন। এখন, আপনি ভালো লোক, দানশীল, মানবিক, তাই বলে আপনার সেই অপকর্মের বিচার হবে না?

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর সম্পাদক আদিলুর রহমান খান শুভ্র এবং পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে ৬১ জনের মৃত্যুর বানোয়াট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি ও প্রচার করে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নের অপচেষ্টা চালান। বিভিন্ন গণমাধ্যমের ও সরকারের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, তার তালিকার ৬১জন মৃত ব্যক্তি আসলে মৃত নন। পরে তাদের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারার মামলা হয়। ২০১৩  সালের ৪ মে শাপলা চত্তরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অভিযানে নিহতের সংখ্যা প্রকাশ নিয়ে দায়ের করা মামলায় আদিলুর ও এলানের দুই বছর করে কারাদণ্ড দেন ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ এম জুলফিকার হায়াত৷

এরপরই শুরু হয় মানবাধিকার নিয়ে বিশ্বমোড়লদের নতুন বয়ান। দণ্ডাদেশ বাতিল করে তাঁদের নিঃশর্ত মুক্তি চেয়েছে ৭২টি মানবাধিকার সংগঠন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন দেশের এই সংগঠনগুলো। কোনো ধরনের ভয়ভীতি, হয়রানি ও প্রতিহিংসা ছাড়াই মানবাধিকারকর্মীদের প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত। মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য প্রকাশ করায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা ও শাস্তি না দিয়ে, বরং যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয় ৭২ সংগঠনের বিবৃতিতে।

আদৌ এই সংগঠনগুলো প্রকৃত ঘটনা বুঝতে সক্ষম কিনা সেই প্রশ্ন তোলার আগে দেখা দরকার যে, ২০১৩ সালের সেইদিন শাপলা চত্বরে কী ঘটেছিলো। এবং আদিলুরের সংগঠন অধিকারের পরবর্তীতে ভূমিকা কী ছিলো? আর এই আদিলুর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয়ইবা কী?

যারা আদিলুরের মানবাধিকারকর্মী হিসেবে সাজা পাওয়া নিয়ে কথা বলছেন তারা একবার বিবেচনায় নিবেন কি, ‘অধিকার’ সংগঠনের সম্পাদক বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনামলের একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হয়েছিলেন। তৎকালে ধারণা করা হতো, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হয়েও যাবেন। বিএনপিকর্মী থেকেই আদিলুর রহমান মানবাধিকারকর্মীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। এবং একজন মানবাধিকারকর্মী যখন রাজনৈতিক দায়িত্বশীল পদে থাকেন তখন তিনি নিরপেক্ষভাবে কতটুকু অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করবেন তা বরাবরেই প্রশ্নবিদ্ধ। আদিলুরের কর্মকান্ডে পরবর্তীতে তা প্রতীয়মান হয়।

হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকায় মতিঝিলের শাপলা চত্বরে বিতর্কিত ১৩ দফা দাবিতে অবরোধ কর্মসূচি পালনের নামে দিনব্যাপী তাণ্ডব চালায়। সন্ধ্যার পরে তারা রাতেও অবস্থানের ঘোষণা দিলে সেখান থেকে তাদের জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়। তারা উল্টো দাবি  ‘শতশত হেফাজত কর্মী নিহত হয়েছে’ দাবি করলেও এর স্বপক্ষে কোনও তথ্য প্রমাণ আজ পর্যন্ত উপস্থাপন করতে পারেনি সংগঠনটি। জানা যায়, ৯ বছর আগে রুদ্ধদ্বার এক বৈঠকের লিখিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েছিল হেফাজতে ইসলাম। ২০১৩ সালেন ৪ মে লালবাগ জামিয়া কোরয়ানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় সংগঠনের শীর্ষ নেতারা ওই রূদ্ধদ্বার বৈঠকটি করেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যে কোনও মূল্যে ঢাকা ঘেরাও করা হবে এবং অবরোধ পরবর্তী সমাবেশ শেষে অবস্থান কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। সংগঠনটি যদিও সেদিন দোয়া মাহফিল করতে শাপলা চত্বরে আসার কথা বলেছিল। সেদিন মতিঝিল এলাকায় প্রায় ৮ ঘণ্টা তাণ্ডব চালায় হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাতে বিজিবি, ব়্যাব ও পুলিশের যৌথ বাহিনী মতিঝিলকে ঘিরে অভিযান চালালে পিছু হটে তারা।

কী ছিলো সেই প্রতিবেদনে?

পুলিশের তদন্ত মোতাবেক, ২০১৩ সালে অধিকার থেকে প্রকাশ পায় 'হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এর সমাবেশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন' শীর্ষক প্রতিবেদন। যেখানে উল্লেখ করা হয় ওই সমাবেশে ৬১ জন হেফাজত নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে একই ব্যক্তির নাম কয়েক জায়গায় উল্লেখ করে নিহতের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫টি ক্রমিকে একই ব্যক্তির নাম দুইবার দেয়া হয়েছে। সেইসাথে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত হিসেবে দেখানো হয়েছে ৪ স্থানে। অন্যদিকে, ৭ জনের নামে ভুল তথ্যসহ তালিকায় কাল্পনিক চরিত্রের নাম ঢোকানো হয়েছে আরও ১১টি। নিহতের তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ওই তালিকায় নিহত ৬১ জনের মধ্যে ৩৪ জনের নামের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে।

শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়ে দিনব্যাপী তান্ডব চালানোর সেই দিন যারা স্মরণ করতে পারেন তারা কি নিজেদের একটা প্রশ্ন করবেন? ওই দিন রাতের ঘটনার পরে যখন ৬১জন নিহতের মিথ্য তালিকা কোন মানবাধিকার সংগঠন সামনে আনে তখন তাকে বিচারের মুখোমুখি করা কীভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়?  তিনি মানবাধিকার সংগঠন করেছেন, সেই সংগঠনের তিনি নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি বেশকিছু মিথ্য তথ্য দিয়ে যদি ঘোলাটে ও রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তোলেন তাকে কী করা উচিত ছিলো বলে মনে করেন? আর দশজন মানুষ কোন কাজ করলে যে প্রক্রিয়ায় তাকে শাস্তি পেতে হতো, সেই একই প্রক্রিয়া আদিলুরের বেলায় কেনো নেওয়া যাবে না? একই রাষ্ট্রে কীভাবে একই অপরাধে দুইরকম নিয়ম হতে পারে। ফলে যারা দাবি করছেন, এই রায় বাতিল করতে হবে, আদিলুর ও এলানকে মুক্তি দিতে হবে তারা আইনের শাসনের কথা পরবর্তীতে বলতে পারবেন তো? বিস্ময় জাগে যখন মানবাধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তারা এমনভাবে বিষয়টি উত্থাপন করছেন যে – আদিলুরকে বিচারের মুখোমুখি করলে মানুষ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে ভয় পাবে। এবং একজন অধিকার কর্মীকে শাস্তি দেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের অধিকার নিশ্চিতের বিষয়টি ব্যাহত হবে। আসলেই কি তাই? মানবাধিকারকর্মী বা তার প্রতিষ্ঠান থেকে যখন ভুল তথ্য ছড়ানো হবে তখন কী আদৌ তিনি বা তার প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার যোগ্যতা রাখেন? সেই জায়গায় প্রশ্ন উত্থাপন করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।